বৌদ্ধধর্মে দান (পাঠ : ১)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - দান | NCTB BOOK
612

যা দেওয়া হয় তা-ই দান। তবে 'দান' নিঃস্বার্থ ও শর্তহীন। যিনি দান করবেন তিনি নিঃস্বার্থভাবে দেবেন। ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাদ্য কিংবা শীতার্ত ব্যক্তিকে বস্ত্রদান করে বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করা হয় না। এখানে দাতার কোনো স্বার্থ নেই। আমরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অথবা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দান করে থাকি। এরূপ দান নিঃস্বার্থ। আমরা অসুস্থ ব্যক্তিকে ঔষধ, সেবা, রক্ত, আর্থিক সহায়তা দান করি। এখানেও দাতার স্বার্থ থাকে না। বৌদ্ধধর্মে শুধু মানুষের দান নয়, পশু-পাখির দানের কাহিনিও আছে যা বুদ্ধের জীবনী ও জাতক পড়ে জানা যায়। যেমন, বুদ্ধ যখন পারলেয়া বনে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁকে বানর ও হাতি মধু ও ফল দান করত। দানকর্মের জন্য তারা বৌদ্ধ সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। আমরা যদি প্রকৃতির দিকে তাকাই, তবে দেখি যে, গাছ আমাদের ছায়া দান করে; ফুল অকাতরে সুরভি ও সৌন্দর্য দান করে; নদী তার সুমিষ্ট জল অকৃপণভাবে ।

দান করে। পরের জন্য এই অকাতর দান থেকে আমরা দানের মহত্ব উপলব্ধি করতে পারি। বৌদ্ধধর্মে 'দান' -এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। বৌদ্ধধর্মের অনুসারীরা শুধু মানুষকে দান করেন না, পশু-পাখি এবং অদৃশ্য প্রাণীদেরও দান করেন। এ ধর্মে মৈত্রী দান করা যায়। 'মৈত্রী' হচ্ছে সকলের ভালো হোক এরূপ বন্দনা করা। সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী দান বৌদ্ধধর্মে দানের অনন্য বৈশিষ্ট্য। দান শুধু সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। ধনী ব্যক্তি যদিঅনেক কিছু দান করেন কিন্তু চিত্তের পবিত্রতা বা মৈত্রীপূর্ণ দানের চেতনা না থাকে, সে দানও যথার্থ হয় না। বিশেষত বৌদ্ধদের দান দেওয়ার সময় দানীয় বস্তু, দাতা ও দান গ্রহীতার গুণাগুণ সম্পর্কে বিবেচনা করতে হয়। দানের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ: ১। বস্তু সম্পত্তি ২। চিত্ত সম্পত্তি ৩। প্রতিগ্রাহক সম্পত্তি।
বস্তু সম্পত্তি: সৎ উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি দান করা উচিত। এতে বেশি ফল লাভ করা যায়। সৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা বস্তু দান করলে তাকে উত্তম দান বলা হয়। তাই সৎ উপায়ে অর্জিত দানীয় বস্তুকে বস্তু সম্পত্তি বলা হয়।
চিত্ত সম্পত্তি: দান করার সময় মৈত্রীপূর্ণ কুশল চেতনা নিয়ে দান করতে হয়। বুদ্ধ বলেছেন, চেতনা থেকে উৎপন্ন সৎ কাজই উত্তম কর্ম। লোভ, ঈর্ষা, হিংসা, মোহ ও সংকীর্ণতামুক্ত হয়ে দান করার ইচ্ছাই চিত্ত সম্পত্তি। এরূপ দানই উত্তম দান।
প্রতিগ্রাহক সম্পত্তি: শীল পালন দানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শীলে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির দান ও শীলে প্রতিষ্ঠিত দান গ্রহীতার ওপর দানের সুফল নির্ভর করে। শীলবান দান গ্রহীতা হচ্ছেন দান গ্রহণের উপযুক্ত পাত্র। অর্থাৎ দান করার সময় দানের উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচিত করা উচিত। নৈতিক চারিত্রিক গুণসম্পন্ন শীলবান ব্যক্তিকে দান করলে তা উত্তম দান বলে বিবেচিত হয়। শীলবান গ্রহীতাকে প্রতিগ্রাহক সম্পত্তি বলা হয়।

দাতার বৈশিষ্ট্য:

১। দান ও দানফলে প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে।
২। দানীয় বস্তু ও গ্রহীতার প্রতি অবহেলা করা উচিত নয়। দাতার নিজের হাতে দান করা উচিত।
৩। কৃপণতা ও অনুরাগ বর্জন করে উদার চিত্তে দান করা উচিত।
৪। সঠিক সময়ে উপযুক্ত পাত্রে দান করা উচিত।
৫। দানের সময় নিজেকে উত্তম ভেবে গ্রহীতাকে অধম মনে করা উচিত নয়।

দাতার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে দাতাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এঁরা হচ্ছেন:

১। দানদাস
২। দানসহায়
৩। দানপতি

দানদাস: যে দাতা নিজে যা খান তার চেয়ে খারাপ খাবার দান করেন তাকে দানদাস বলা হয়।
দানসহায়: যে দাতা নিজে যেরূপ খান অপরকে সেরূপ দান করেন তাকে দানসহায় বলা হয়।
দানপতি: যে দাতা নিজে সংযম পালন করে উৎকৃষ্ট বস্তু দান করেন তিনি দানপতি।

অনুশীলনমূলক কাজ
দানের বিবেচ্য বিষয় কী কী?
দান করতে হলে দাতার কী কী গুণ থাকতে হবে, উল্লেখ করো।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...